মনোজ বসু বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম কারিগরজল-মাটি-মানুষের কাহিনী মনোজ বসুর (১৯০১-১৯৮৭) লেখনী থেকে অসাধারণ সারল্য ও সপ্রতিভ মুগ্ধতায় বিধৃত হয়েছে। কবিতা দিয়ে মনোজ বসুর সাহিত্যচর্চার যাত্রা শুরম্ন। পরে তাঁর লেখনী থেকে নির্মিত হলো গল্প এবং আরো পরে উপন্যাস। ২৫ জুলাই ১৯০১ সালে যশোর জেলার ডোঙ্গাঘাটা গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা রামলাল বসু কবিতা লিখতেন। পুরম্নষানুক্রমে লেখালেখির বীজ মনোজ বসুর রক্তের মধ্যে নিহিত ছিল সে কথা মনোজ বসুর নিজের লেখা থেকে জানা যায়। 'বাবা অল্প স্বল্প লিখতেন। ঠাকুর দাদার হাতে লেখা বড় কেতাব অতি শৈশবে দেখেছি_ নিজের অথবা অন্যের ভেতরে নকল করা কঠিন বলতে পারবো না। লেখার বীজ ছিল অতএব রক্তের মধ্যেই।ন মনোজ বসুর হাতেখড়ি কবিতা দিয়ে, যে কবিতায় জল-মাটি-মানুষ আর গ্রামবাংলার উদ্ভাস এভাবে_ 'বিল-কিনারায় উড়ে চলেছিল/সাদা বকগুলি_/মেঘের গলায় সাতনলী হার/যা যেন দুলি দুলি।ন

মনোজ বসু অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করতে সৰম হন। ১৯৭৫ সালে তার লেখা ক্লাসিকধর্মী অসাধারণ উপন্যাস 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন আজ প্রকাশের মাধ্যমে। অনেক পথ পাড়ি দিতে হয় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করার জন্য। তাঁর গল্প ও উপন্যাসের উপর আলোচনা করার আগে অবশ্যই ব্যক্তি মনোজ বসু সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে হলেও কিছু বলতে হয়।

মনোজ বসুর শৈশবের বোধোদয় ঘটে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন উত্তরকাল পবরাউ। তাঁর বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা মানুষ। বাবার স্বাধীনচেতা মানসিকতা পুত্রের মধ্যেও সঞ্চারিত হয় ছাত্রজীবনে। মাত্র আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু বালক মনোজ বসুর জীবনকে ভয়ংকর অবস্থায় ফেলে। দারিদ্রে্যর চরম যন্ত্রণা তাঁর ছাত্রজীবনকে টালমাটাল করে তোলে।

দারিদ্র্য ও পরাধীনতার যন্ত্রণাই মনোজ বসুকে উদ্দীপ্ত করে একাগ্র ও একগুঁয়ে করে তুলতে। দারিদ্রে্যর সঙ্গে লড়াই করে তিনি তাঁর শিৰাজীবন সমাপ্ত করেন। ১৯২২ সালে বাগেরহাট কলেজ থেকে আইএ পাস করে কলকাতার সাউথ সুবারবন (র্বতমানে যা আশুতোষ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস শেষে ১৯২৫ সালে ওই কলেজের কলেজিয়েট স্কুলে শিৰকতা লাভ করেন। মনোজ বসুর প্রাক-সাহিতি্যক জীবনে স্কুলের শিৰকতার সাথে সাথে গৃহশিৰকতাও করতে হয়।

আগেই বলা হয়েছে মনোজ বসুর স্বাধীনচেতা মানসিকতা লাভ করেন পিতার স্বাধীনচেতা মনোভাবের উত্তরাধিকার থেকে। স্বাধীনচেতা মানসিকতায় উ্টদু্ধ হয়েই মনোজ বসু বাগেরহাট কলেজে আইএ পড়ার সময় যুগানত্দর দলের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। পরে তিনি গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনে শামিল হন। এক পর্যায়ে পলস্নী সম্পদ সংরৰণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা গুরম্নসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওই আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে গ্রামে গ্রামে ঘোরার সুযোগ লাভ করেন। গ্রামের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে অনত্দরঙ্গ যোগসূত্রের ফলে মনোজ বসু গ্রামীণ সমাজজীবন সম্বন্ধে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তার আলোকেই তাঁর সাহিতি্যক জীবনের যাত্রা শুরম্ন হয়।

১৯৩২ সালে তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন 'বনমর্মরন প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম গল্প আত্মপ্রকাশ করে ১৯২০ সালে 'বিকাশন পত্রিকায়। সে সময় তাঁর পুরো নামই ব্যবহার করতেন মনোজমোহন বসু। 'রেশমী রম্নমালন গল্পখ্যাত আর এক লেখক এই নামে র্বতমান থাকায় মনোজ বসু নিজের নাম সংৰেপ করে নেন। একপর্যায়ে কলকাতার দেশ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হয়। উলেস্নখযোগ্যসংখ্যক ছোটগল্প ও তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'নিশিকুটুম্বন, 'জলজঙ্গলন, দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

একটানা বিশ বছর শিৰকতা করার পর মনোজ বসু পুরোপুরিভাবে সাহিত্য সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। শুধু লেখক হিসেবে নয়, প্রকাশক হিসেবেও প্রকাশনা জগতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সে সম্বন্ধে পরে আসছি।

বাংলা সাহিত্য জগতে পুরোপুরিভাবে আত্মনিয়োগ করে একে একে রচনা করেন বিভিন্ন অনুষ্পগ আর আঙ্গিকের উলেস্নখযোগ্যসংখ্যক উপন্যাস। এর মধ্যে ভুলি নাই, বাঁশের কেলস্না, নিশিকুটুম্ব, নবীনযাত্রা, নূতন প্রভাত, মানুষ গড়ার কারিগর, আমার ফাঁসী হল, বন কেটে বসত, পৃথিবী তাদের ইত্যাদি। এ ছাড়া ভ্রমণকাহিনী ও নাটক রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্য শাখা দুটোতে বিশেষ অবদান রাখতে সৰম হন। চীন ছেড়ে এলাম, সোভিয়েতের দেশে দেশে, নতুন ইউরোপ, পথ চলি, তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনী।

মনোজ বসুর লেখা 'নিশিকুটুম্বন বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ ক্লাসিকধর্মী উপন্যাস। সিঁধেল চোর, পকেটমারদের মতো সমাজের কীটদের জীবন-জীবিকা আর তাদের বদ পেশার ক্রিয়াকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ যে চিত্র অসাধারণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মনোজ বসু তাঁর লেখা ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস 'নিশিকুটুম্বনতে এঁকেছেন, তা এককথায় অনন্য।

'নিশিকুটুম্বন অর্থাৎ চোর কর্তৃক প্রহারের কূটকেনশলে চেনর্যকর্ম করে তার বাসত্দবচিত্র তাঁর নিশিকুটুম্ব উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে। এককালে সিঁধেল চুরির চোরের দেনরাত্মে্য গ্রামদেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। 'নিশিকুটুম্বন উপন্যাসে এ দেশের দৰিণ-পনিম এলাকার নদী-নালায় ঘেরা সেকালের জনপদে নিশিকুটুম্বদের চেনর্যবৃত্তির নানা কেনশল অবলম্বনের কাহিনী অসাধারণ ভাষায় তিনি এ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। সুন্দরবনসংলগ্ন বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলার দৰিণাঞ্চলের পটভূমিকায় এ উপন্যাস গড়ে উঠেছে। কলকাতা শহরের পকেটমারদের কথাও বাদ পড়েনি। পাঁচ সিঁধেল চোরের শিরোমনি বা ওসত্দাদ। তার যেনবনকাল কেটেছে গৃহসে্থর বাড়িতে সিঁধেল চুরি করে, নিশিরাতে গৃহসে্থর মাটির ঘরে সিঁদ কেটে ঘটিবাটি, কাপড়চোপড় যা পেয়েছে তাই নিয়ে সটকে পড়েছে। এখন সে বয়সের ভারে নূব্জ। তাই সাগরেদদের সিঁদেল চুরি শেখানোর ওসত্দাদ বনে গেছে। এখন সে সাগরেদদের হাতেকলমে সিঁদেল চুরি শেখাতে কালেভদ্রে নূব্জদের সিঁদেল চুরিতে অংশগ্রহণ করে। এ উপন্যাসে শুধু গ্রামবাংলার সিঁদেল চোরদের কথাই আসেনি, এসেছে কলকাতার নষ্ট সমাজ থেকে জন্ম নেয়া 'সাহেবন নামের এক কিশোর। নিশিকুটুম্ব উপন্যাসে লেখক অনেক গল্প তুলে ধরেছেন। সেই গল্পগুলোর মধ্যে রসালো অনুষ্পগে আধিক্য মোটেই কম নয়। এ উপন্যাস পাঠে পাঠক অপরাধ জগতের অনেক অজানা কথা জানতে পারবেন। এ উপন্যাসে লেখক রসাত্মক ভাষায় গল্প নির্মাণ করেছেন, তাই পাঠক অবশ্যই এ উপন্যাস পাঠ করে চেনর্যবৃত্তি সম্পর্কে অনেক অজানা রম্যও গ্রহণ করতে পারবেন। ১৯৬৬ সালে নিশিকুটুম্ব উপন্যাসের জন্য মনোজ বসু সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার লাভের অনন্য সম্মান অর্জন করেন। আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন মনোজ বসুর অসাধারণ ক্লাসিক উপন্যাসের কথা। মনোজ বসু এ উপন্যাসের মালমসলা সংগ্রহ করেছেন নিজের জন্মভূমি গ্রামবাংলা থেকে। গ্রামবাংলার মাঠ, ঘাট, নদী-নালা, হাটবাজার, পাখ-পাখালি তাকে মজিয়েছিল একসময়। তাঁর নিজের জীবন থেকে হারানো গ্রামবাংলার একানত্দজনদের অভাব বোধ করেছেন একসময় তিনি তীব্রভাবে। স্মৃতিচারণায় তিনি বারবার প্রকাশ করেছেন ছেলেবেলার সেই জীবনকে।

কলকাতা জীবনপবরাউ সাফল্য ও প্রতিষ্ঠা লাভ করা সত্ত্বেও মনোজ বসু গ্রামবাংলার স্মৃতিকে ভুলতে পারেননি। ভুলতে না পারায় দলিল তাঁর লেখা 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসটি। তিনি অসাধারণ মুগ্ধতায় সহজসরল ভাষায় গ্রামবাংলার নানা ছবি অঙ্কন করেছেন এই উপন্যাসে। এই উপন্যাসের কথা না বললে মনোজ বসুর সাহিত্যকর্মের দৰতার কথা না বলা থেকে যাবে।

যশোর-খুলনা-চবি্বশ পরগনার গ্রাম পটভূমি ও জনজীবনের নানা আচার অনুষ্ঠানের কথা লেখক 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। বিশ শতকের প্রথম পচিশ-তিরিশ বছরকাল পবরাউর গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখের কাহিনী এ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে এই উপন্যাস প্রকাশকালে বিশ শতকের প্রথমপবরাউ গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও মানুষজনের জীবনপ্রবাহ হারিয়ে গেছে। অসাধারণ কথাশিল্পী মনোজ বসু স্মৃতির ভানার থেকে হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার মানুষের জীবন প্রবাহকে অনবদ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সোনাখড়ি গ্রামের ভবনাথ ঘোষা হলেও লেখক শুধুমাত্র তাকে ঘিরেই সমসত্দ ঘটনা এগিয়ে নেননি, এটাই অসাধারণ ঔপন্যাসিক হিসেবে মনোজ বসুর কৃতিত্ব। গতানুগতিক ধারার মতো এই উপন্যাসে আসলে কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। সমগ্র সোনাখড়ি গ্রামটিই যেন একটা চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, আর এই গ্রামটির নর-নারীর চরিত্রগুলো নানা অনুষ্পগে আবর্তিত হয়েছে এই উপন্যাসে। আগেই বলা হয়েছে এ উপন্যাসটি ব্যতিক্রমধর্মী আঙ্গিকে নির্মিত। এবার সেই প্রসঙ্গেই বলতে হয়। কাহিনী বা চরিত্র, বিশেষ কোনো একটি একক চরিত্রের প্রাধান্য এই উপন্যাসে নেই। ছোট বড় চরিত্র, ঘটনা, গ্রাম্য পরিবেশের নানা দিক একে একে এই উপন্যাসে উঠে এসেছে। যূথবদ্ধ জীবনচিত্রই এ কাহিনীর মূল বৈশিষ্ট্য। কোনো চরিত্রকে প্রাধান্য না দিয়ে সবগুলো চরিত্রকে সমান গুরম্নত্বসহকারে উপস্থাপন করার কৃতিতে্বর জন্য অসাধারণ লেখক মনোজ বসু নিঃসন্দেহে বোদ্ধা পাঠকের ্টারা নন্দিত হবেন। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, এ কৃতিত্ব তিনি তাঁর লেখা অন্যান্য উপন্যাসেও দেখিয়েছেন।

'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাস মনোজ বসুর শেষ বয়সে লেখা। প্রবীণ বয়সেও লেখক হিসেবে তিনি কতটা দৰ, তার দৃষ্টানত্দ এই উপন্যাস। অনেক দিন আগে গ্রাম ছেড়ে আসা কলকাতার জীবনেও পূবরাউ তার দেখা গ্রামবাংলার নদীনালা, হাওর-বাঁওড়ের নানা কথা তিনি ভোলেননি। 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসের ভূমিকায় তিনি যে কয়েকটি বাক্য লিখেছেন তার সঙ্গেই এই উপন্যাসে কী কথা উপস্থাপিত হয়েছে তার ইঙ্গিত রয়েছে। উপন্যাসটির প্রারমে্ভর ভূমিকাটি এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। 'তোমরা ছিলে। ত্রিভঙ্গ-স্বাধীনতার তাড়নায় বড় তাড়াতাড়ি হয়ে গেলে। হাজার দীর্ঘশ্বাসে তোমাদের অনিত্দমতর্পণ।ন_ ১ পেনষ ১৩৮২।

এই গ্রনে্থর ভূমিকায় লেখা কথাগুলোতে আপনজনকে স্মরণ করা হয়েছে এবং প্রতীকী স্মরণের বেদনার্ত সংৰিপ্ত বাণীতে উদ্দিষ্ট রয়েছে আরেক পূর্ববঙ্গের হারিয়ে যাওয়া জীবন ও জীবনের নানা প্রকারণ।

সোনাখড়ি নামের কোন গ্রামের ঐতিহাসিক কিংবা ভেনগোলিক সত্তা আদেন মন্ত্র কথা নয়। সোনাখড়ি পূর্ববঙ্গের হাজার হাজার গ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মনোজ বসুর 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসের সোনাখড়ি গ্রাম আর সেই গ্রামের ভবনাথ-দেবনাথ-মুক্তকেশী-অলকা বউ, উমাসুন্দরী-কমল ও আরো অনেকে হারিয়ে যাওয়া পূর্ববঙ্গের এক একজন জীবনত্দ প্রতিনিধি। র্বতমান প্রজন্মের তরম্নণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেকালের জনপদ আর সেকালের গ্রামবাংলার জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের পু্ঙ্খানুপুঙ্খ জীবনত্দ দলিল হিসাবে মনোজ বসু 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাস লিখে রেখে গেছেন।

জল-মাটি আর মানুষের পটভূমিকায় 'জলজঙ্গলন ও 'বন কেটে বসতন মনোজ বসুর মধ্য জীবনে লেখা দুটো শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরম্ন করে ধাপে ধাপে গল্প উপন্যাসে এগিয়ে চলার মাঝে মনোজ বসু অভিজ্ঞাতা, কল্পনা, সামাজিক দায়বদ্ধতার মিশেলে অনত্দরঙ্গ যোগসূত্র বিশেষভাবে কাজ করেছে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না তাঁর ক্লাসিকধর্মী উপন্যাসগুলো পড়লে।

বাংলা সাহিত্য জগতে মনোজ বসুকে অমরত্ব দান করতে বিশেষ ভূমিকা রাখা উপন্যাস 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন এর ওপর আরো কিছু আলোচনা করার আগে তাঁর লেখা অন্যান্য গ্রন্থগুলো সম্বন্ধে স্বল্প পরিসরে দু-একটা কথা বলে দিতে চাই।

মানুষ গড়ার কারিগর মনোজ বসুর বিশ বছরের শিৰকতা জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোতে লেখা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য উপন্যাস। সম্ভবত তিনিই বাংলা সাহিত্যে একমাত্র লেখক যিনি শিৰকদের মানুষ গড়ার কারিগর অভিধায় অভিহিত করেছেন। ব্রনচারী আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে গ্রামের মানুষের অনত্দরঙ্গ সানি্নধ্য থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা তাকে 'ভুলি নাইন, 'বাঁশের কেলস্নান, 'সৈনিকন, 'আগস্ট ১৯৪২ন, 'নতুন প্রভাতন, 'নবীন যাত্রান, 'রাখী বন্ধনন ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করতে উ্টদু্ধ করে।

শিৰকতার পেশা ত্যাগ করে বাংলা সাহিত্য জগতে নিজেকে সঁপে দিয়ে মনোজ বসু ব্যর্থ হননি। একাগ্র পঠনপাঠন, সুচিনিত্দত মনন, অসীম ধৈর্য আর অধ্যাবসায় তাঁকে বাংলা সাহিত্য জগতে স্থায়ী আসন দান করেছে।

আবারও মনোজ বসুর অমর সাহিত্যকর্ম 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসের প্রসঙ্গে বলতে হয়। বাংলা উপন্যাসে সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখকদের প্রত্যেকেরই একটা মাস্টার পিস আছে। যেমন বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী, মানিক বন্দে্যাপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, তারাশঙ্করের হাসুলী বাঁকের উপকথা, অ্টৈত্য মলস্নর্বমণের তিতাস একটি নদীর নাম, সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর লালসালু, আখতারম্নজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সিপাই, সমরেশ বসুর গঙ্গা ইত্যাদি ঠিক তেমনই মনোজ বসুর সাহিত্যকর্মের মাস্টার পিস, 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীতে অপুকে কেন্দ্র করে গল্প আবর্তিত হয়েছে। মানিক বন্দে্যাপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, অ্টৈত্য মলস্নর্বমণের তিতাস একটি নদীর নাম ও সমরেশ বসুর গঙ্গা উপন্যাসে জল, নদী আর মাছমারা জেলে কিংবা মালোদেরকে কেন্দ্র করে গল্প নির্মিত হয়েছে। আখতারম্নজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস 'চিলেকোঠার সিপাই নিকট অতীতের সমাজের দৃশ্যপট বণর্িত হয়েছে, অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর লালসালু উপন্যাসে মাজারকেন্দি্রক ভনামি আর কুসংস্কারের বাসত্দব চিত্র উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন। পৰানত্দরে মনোজ বসু তার 'সেই পথ সেই সব মানুষন উপন্যাসে অন্য ঘরানার চিত্র চিত্রণে প্রয়াসী হয়েছেন। তাঁর এই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ নায়ককেন্দি্রক নয়, তার আভাস আগেই দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কতো না সংস্কার, পালা-পার্বণের কথা নিবিড় প্রেমসিক্ত চিত্রণে তথ্যনিষ্ঠভাবে তাঁর লেখনী থেকে গ্রন্থিত হয়েছে। গ্রামীণ প্রথা ও বিশ্বাসকে চিরস্মরণীয় করে রাখবার জন্য তিনি কেমন সচেষ্ট হয়েছেন। তার দু-একটা উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে। তিনি বলেছেন নষ্ট চন্দ্রের কথা, ভাদ্রসংক্রানিত্দর কথা, মহালয়ার তর্পণের পর আকাশে প্রদীপ জ্বালানোর সংস্কার, দুর্গাপূজার শুক্লপৰের ষষ্ঠীর দিন থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা অবধি ঢেঁকির পাড় পড়তে নেই, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় নিশি জাগরণ_ অলক্রীড়া চিপিটক (চিড়া) নারিকেলোদক ভৰণ, তিরিশে আশি্বনসংক্রানিত্দর দিন ধানবনকে সাধ খাওয়ানো_ অর্থাৎ ধানের ৰেতকে মা ডেবে, মাকে গর্ভবতী কল্পনা করে মায়ের সুসনত্দান জন্মাবে এই কল্পনায় মাকে সাধ খাওয়ানো, গারসির রীতিকর্মসহ প্রাচীন বাংলার কত না প্রথা, সংস্কারের কথা মনোজ বসু তার এই উপন্যাসে গভীর মমতায় লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি অপূর্ব নিপুণতায় নৃতাত্তি্বক ও সমাজতাত্তি্বক চেতনায় প্রাচীন গ্রামবাংলার সংস্কারের কথা বলেছেন। প্রাচীন বাংলার দেশগ্রামের কত নাম তাঁর উপন্যাসে উঠে এসেছে। বেলতলি, খেজুরতলি, নারকেলতলি, জামতলি, ডুমুরতলি কত না গ্রামের নাম। নানা জাতের আমের নাম যেমন_ গোললাধোপা, কালমেঘ, কানাইবাঁশী, টুরে, চ্যাটালে চুকি, কালমেঘা। গ্রামবাংলার কত না ধানের নাম কাজলা, অমৃতশাল, নারকেলফুল, গজমুক্তা, সীতাশাল, গিনি্নপাগলা, শিবজটা, সোনাখড়কে, সূর্যমণি, পায়রাউড়ি, বাদশাপছন্দ ইত্যাদি।

মনোজ বসু তাঁর 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাসে রক্ত-মাংসের জীবনত্দ যেসব মানুষের ছবি এঁকেছেন সে সম্পর্কে না বললে অনেক কথাই অসমাপ্ত থেকে যায়। তাঁর উপন্যাসের উৎসর্গপত্রেই ফিরে যেতে হবে মানুষগুলোর পরিচয় তুলে ধরবার জন্য। আমার এই দীর্ঘশ্বাস তোমাদের 'অনিত্দম তর্পণ।ন কাদের জন্য তার এই দীর্ঘশ্বাসিত স্মৃতিতর্পণন নিপুণ মূত্রধারের মতো বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি প্রবিষ্ট তুলেছেন এই কাহিনীর নির্মাতা। উপন্যাসের কাহিনী এভাবে শুরম্ন হয়েছে 'যবনিকা তুলছি। এই শতকের পাদ। মানুষেরা সেই সময়ের। গ্রামের চেহারা ভিন্ন।ন

মনোজ বসু স্মৃতির উজান ঠেলে পাঠককে নিয়ে গেছেন গত শতানীর প্রথম পাদের কালপবরাউ। সোনাখড়ি গ্রামের জমিদারি সেরেসত্দার সদর নায়েব 'ধনীমানী গৃহস্থ দেবনাথ ঘোষ, তার দাদা ভবনাথ, শ্রী তরঙ্গিনী, বেনদি উমা সুন্দরী, দিদি মুক্তকেশী, ছেলে কমল, মেয়ে চঞ্চলা_ এদের পাশাপাশি এসেছে পরিবারের অন্যান্য মানুষেরা, এসেছে গ্রামের নানা বৃত্তিজীবী মানুষের বিচিত্র মুখের ছবি। দেবনাথ ঘোষের ছেলে কমল যেন কিশোর মনোজ বসু_ 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন হতে আকৈশোর ভাগ্য-নির্বাসিত স্বপ্ন-সংযোগের সূত্রটুকু ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিলে ওই ত্রিভঙ্গ তাড়নান অনেকটা আৰরিক অর্থেই 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন শিল্পীর অগ্রজ রচনা। গল্পের শরীরে কমলের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে থেকে থেকেই শিশু মনোজ বসুকে চোখে পড়ে, স্বদেশী সভায় দেবনাথের হাত ধরে চলা কমলের মধ্যে পিতা রামলাল বসুর হাত ধরে চলা চার পাঁচ বছরের মনোজ বসুকে গোপন রাখা সম্ভব হয়নি। যিনি স্বদেশী সভায় গিয়ে বন্দেমাতরম গান শুনে এসেছিলেন। তা ছাড়া দেবনাথকে ঘিরে যে পারিবারিক পরিমনল, তার পেছনে ডোঙাঘাটা গ্রামের বসু পরিবারের স্মৃতিই কেবল উঁকিঝুঁকি দেয়নি; সেসব রচনার সঙ্গে বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন যেন সুধা হয়ে ঝরেছে শিল্পীর মনের গহন হতে।

মনোজ বসুর এই উপন্যাসের নামকরণ সর্বাঙ্গ সার্থক এবং সৃজনী গুণসম্পন্ন। 'তোমরা ছিলেন_ এই জীবনকাহিনী কোনক্রমেই কল্পকাহিনী নয়। বাঙালির সেদিনে সংস্কৃতি আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মনোজ বসুর কাহিনীতে শুধু যে বিস্মৃতপ্রায় সংস্কৃতি বিধৃত হচ্ছে তাই নয়, এ কাহিনীতে একটা মহাকাব্যোচিত এপিক সঙ্গত বিশালতা, গভীরতা, সূৰ্নতা আর ব্যাপকতার রূপ ধরা পড়েছে।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা কথাসাহিত্যে মনোজ বসুর 'সেই গ্রাম, সেই সব মানুষন উপন্যাস বিরাট সাহিত্যের মর্যাদায় অভিসিক্ত হবে।

মনোজ বসুর 'বেঙ্গল পাবলিশার্সন নামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাংলাসাহিত্যের লেখক সমাজের কাছে সাহিত্য সাধনার পীঠস্থান হিসেবে গণ্য হয়। তিনি সাহিত্য সাধনার সঙ্গে সঙ্গে 'বাংলার শক্তিন ও 'সাহিত্যের খবরন পত্রিকা সম্পাদনার কাজ সুচারম্নরূপে সমাধা করেন। পি ই এন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সাহিত্য একাডেমীর সদস্য ছিলেন ১৯৭৮-৮২ সাল পর্যনত্দ। নানান সূত্রে বহু দেশ ঘোরার সুযোগ হয়েছে তাঁর। গল্প উপন্যাস নাটক রম্যরচনা ভ্রমন কাহিনী_ সব মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা প্রায় দেড়শ। তাঁর বহু ছোটগল্প ইংরেজি, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠী ও মালয়ালম ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্ররূপ পেয়েছে অনেকগুলো কাহিনী। তিনি পুরস্কার পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমী, নরসিংহ দাস, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার। মতিলাল পুরস্কার, শরৎ স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি।

সম্পাদক: মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। সম্পাদক কর্তৃক ১৪৬ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (৪র্থ তলা), ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত ও ডেসটিনি প্রিন্টিং প্রেস ১৩/২/এ কেএম দাস লেন, গোপীবাগ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ: আলীগড় হাউস, ১৪৬ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০। ফোন: ৭১৭৪৭০২, ৯৫৫৯৯৪৯, ৯৫৫৯০০৬, ৯৫৬৯৭৯৮, ফ্যাক্স: ০৮৮-০২-৭১৬৮২৭৪, ৭১৭০২৮০, ওয়েবসাইট-www.dainikdestiny.com, e-mail: destinyout@yahoo.com, info@dainikdestiny.com